শনিবার ১১ জুলাই ২০২৬ , (০৪:৩৩ PM) / ২৭ আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ব্যবসা-বাণিজ্য

লক্ষ্মীপুরের মেঘনায় ইলিশের বদলে ধরা পড়ছে রুই-কাতল, জেলেদের হাহাকার

স্টাফ রিপোর্টার   লক্ষ্মীপুর

১৬ জুলাই ২০২৫


| ছবি: নয়া চাঁদ

প্রতি বছরের ন্যায় চলতি বছরের মার্চ-এপ্রিল দুই মাস নদীতে ইলিশ শিকার নিষেধাজ্ঞা ছিল। সে সময় ইলিশ শিকার থেকে বিরত থাকার পর পুনরায় পহেলা মে থেকে নদীতে শিকারে যায় জেলেরা। বহু আশা নিয়ে নদীতে মাছ শিকারে গিয়ে হতাশ উপকূলের প্রায় ৫২ হাজার জেলে। যদিও বলা হচ্ছে বর্ষা মৌসুমে ইলিশের ভরা মৌসুম। এসময় জেলেদের জালে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরার কথা। অথচ লক্ষ্মীপুরের মেঘনায় ইলিশের আকাল চলছে। হতাশা নিয়েই নদী থেকে ফিরতে হচ্ছে জেলেদের। এতে লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের। ৪/৫ জনের এক একটি নৌকায় খরচ হয় সাত থেকে আট হাজার টাকা। মাছ পায় ১৫শ থেকে দুই হাজার টাকা। এতে ঋণের বোঝা প্রতিনিয়তই বাড়তে থাকে। এদিকে অল্প কিছু মাছ ধরা পড়লেও দাম আকাশচুম্বী। সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে ইলিশ। আহরণ কম হলেও জেলার ২৫টি ঘাটেই হালি বা পিস অনুযায়ী ইলিশের নিলাম বা ডাক ওঠে। কেজি দরে কখনো বিক্রি হয়নি ইলিশ। লক্ষ্মীপুর জেলা মৎস্য বিভাগ প্রতি বছর ২৩-২৪ হাজার টন ইলিশ উৎপাদন দেখায়। অভিযোগ রয়েছে সরকার ঘোষিত নিষেধাজ্ঞা, ইলিশের প্রজননের সময় কিংবা মা ইলিশ রক্ষার নিদিষ্ট সময় ক্ষণ সঠিকভাবে হচ্ছেনা। অনুমান নির্ভর তথ্য দিয়ে চলে এসব কর্মযজ্ঞ। নিষেধাজ্ঞার সময় মেঘনার ইলিশ জেলেদের জালে ধরা না পড়ে সাগরে চলে যায়। আর যখন মেঘনার ইলিশ সাগরে চলে যায় তখন আর কোন নিষেধাজ্ঞা থাকেনা। ইলিশ শুণ্য সময় নদীতে মাছ শিকারে গিয়ে হতাশ হয়ে পড়ে জেলেরা। জেলেদের অভিযোগ অফিসে বসে কর্মকর্তারা ‘অনুমান নির্ভর তথ্য’ দেন। কোনো সরকারি-বেসরকারি গণনাকারীকে কখনো কোনো ঘাটে দেখেননি তারা। এসি রুমে বসে মনগড়া হিসেবে প্রকৃত তথ্য আড়াল করছে মৎস্য বিভাগ। মাঠপর্যায়ে কোনো তথ্যই কেউ সংগ্রহ করছে না। এমনটাই অভিযোগ তাদের। যদিও অস্বীকার করছেন জেলা মৎস্য অধিদপ্তর। তারা বলছেন উৎপাদন তথ্য সংগ্রহে ১২টি ঘাটে গণনাকারী রয়েছে। উপকূলের জেলে আবুল কাশেম জানান, নদীতে ইলিশ অনেকটাই শুণ্য। এখন ভরা মৌসম অথচ অল্প সংখ্য ইলিশ ধরা পড়ছে। তবে রুই-কাতল সহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ জালে ধরা পড়ছে। ইলিশ কম থাকায় অনেক জেলে নদীতে যাচ্ছেনা। আবার যারা যাচ্ছে তারা আশানুরুপ ইলিশ পাচ্ছেনা। এক একটি নৌকা সারাদিন জাল মেরে ৪-৫টি থেকে বড়জোর ৮-১০টি ছোট ইলিশ পাচ্ছে। ইলিশ উৎপাদন কম বলেই দাম বাড়ছে। জেলা মৎস্য বিভাগ জানায়, লক্ষ্মীপুরে গত বছর (২০২৩-২৪) ইলিশ উৎপাদন হয়েছে ২৩ হাজার টন। মাছঘাট রয়েছে ২৫টি। এতে প্রতিদিন জেলায় ৮২ টন ইলিশ উৎপাদন হয়েছিল। ২৫টি ঘাটের প্রতিটিতে গড়ে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে তিন টন বা সাড়ে তিন হাজার কেজি ইলিশ উৎপাদন হয়। কিন্তু ঘাটের ব্যবসায়ীরা বলেন, প্রতিটি ঘাটে জেলেরা নদী ও সাগর থেকে এসে ঘাটের আড়তদারদের বাক্সে মাছ রাখে। এরপর উন্মুক্ত নিলামে হালি (৪টি) হিসেবে ইলিশ বিক্রি হয়। ইলিশের আকালের কারণে প্রতিদিন সবগুলো ঘাটে ২০ টন ইলিশও পাওয়া যায়নি। কটরিয়া ঘাটের বৃদ্ধ জেলে সালেহ আহম্মদ বলেন, মৎস্য বিভাগ হয়তো ঢাকা-চট্টগ্রাম, চাঁদপুর ও কক্সবাজারের ইলিশের ওজন হিসাব করে সারা দেশে আনুমানিক উৎপাদন তথ্য দেয়। সেখানেও সমস্যা আছে। সব মাছ মোকামে যায় না। হিসাব করতে হবে ঘাট থেকেই। নদীতে ইলিশ নেই। জাল ফেলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন জেলেরা।কটরিয়া মাছঘাটের আড়তদার আলমগীর মোল্লা বলেন, ইলিশের নিলাম ডাক হালি হিসেবে করা হয়। সব ঘাটেই একই নিয়ম। গত ১১ বছর কখনো কাউকে হিসাব নিতে দেখিনি।জুলফিকার বেপারি বলেন, জেলা মৎস্য বিভাগের হিসাব অনুমাননির্ভর। বিভিন্ন ঘাটে গিয়ে মাছ ক্রয় করে চাঁদপুরে বিক্রি করি। কখনো কোনো কর্মকর্তা বা গণনাকারীকে ঘাটে এসে ইলিশের হিসাব নিতে দেখিনি।জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন জানান, জেলায় ২৫টি মাছঘাট আছে। এর মধ্যে সদর, রামগতি, কমলনগর এরূপ ১২টি বড় মাছঘাটে মৎস্য অফিসের পক্ষ থেকে ১২ জন গণনাকারী রয়েছেন। প্রতি সন্ধ্যায় তারা মৎস্য অফিসে ইলিশ আহরণের হিসাব পাঠান। এর মাধ্যমেই মৎস্য বিভাগ ইলিশ উৎপাদনের হিসাব করেন। সাত বছর ধরে একইভাবে উৎপাদন হিসাব নির্ণয় করা হয়। ২০২৩-২৪ মৌসুমে লক্ষ্মীপুর জেলায় ইলিশ উৎপাদন হয়েছে ২৩ হাজার টন।